সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৩৬ অপরাহ্ন

ছোটগল্ট
অধিকারের রকমফের

অধিকারের রকমফের

সৈয়দ আহসান কবীর


লীলাবতী তাকাল, ‘সম-অধিকার বোঝেন?’ ঘটক ‘না সূচক’ মাথা নাড়লেন। লীলাবতী বিষ্ময়ে তার দিকে চেয়ে রইলেন। শেষ পর্যন্ত দশ লাখ টাকা দেনমোহরে বিয়ে হলো। লেভিডিভও শুনলো। শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো। দেনমোহরের কথা শুনে তার মাথায় তখন টকশোর পুরোনো প্রশ্নগুলো ঘুরছে—পৈতৃক সম্পত্তিতে সমান অধিকার, বৈবাহিক সম্পত্তিতে সমান অধিকার, নারীর নিজের সিদ্ধান্তের অধিকার।
তারপর ভাবলেন, অধিকার বড় বিচিত্র জিনিস। মঞ্চে তার সংজ্ঞা একরকম, সংসারে আরেকরকম। আদার ব্যাপারী, জাহাজের খবর নিয়ে লাভ নেই। অধিকারের ভাবনা শেষ করে লীলাবতীর সাথে টকশোয়ের দিন হেমলতাকে নিয়ে অসমাপ্ত ভাবনা তার চোখে ভর করলো। লিভিডভ সাইকেল চালিয়ে তার কাছাকাছি যাচ্ছে।


লীলাবতী। বয়স বত্রিশ ছুঁইছুঁই। যদিও মেয়েদের বয়স জিজ্ঞেস করতে নেই। তারপরও লেভিডিভ জেনেছিলো। বললো— ‘সেকি! দেখে তো বোঝাই যাচ্ছে না।’ লীলাবতী বিগলিত হয়ে বললো— ‘কি যে বলেন না!’ তারপর দম নিয়ে বললো, ‘যদিও অনেকে বলে, আমি নাকি এখনও ষোড়শীই আছি।’

লেভিডিভ সংবাদপত্রে কাজ করে। একটি টিভি টকশোতে উপস্থাপনাও করে। ‘নারীর দুনিয়া’। শো—এর নামের মধ্যেই বেশ একটা ভাব আছে। নারীর দুনিয়া উপস্থাপনা করায় লিজেন্ড নারীদের সাথে তার বেশ ভাব আছে। এ নিয়ে ঘরেও কমবেশি চলে। কমবেশি চলে বলতে— মান-অভিমানের পালা আরকি!

এই যেমন লিভিডভের স্ত্রী স্লিভলেস পোশাকের নারীদের খুব একটা পছন্দ করে না। নারীর দুনিয়ায় গ্ল্যামার ধরে রাখতে হয়। অতিথি গ্ল্যামারাস না হলে অনুষ্ঠান জমে না। টিআরপি পড়ে যায়। স্পনসর হাওয়া। অনেকেই গ্লামারাস ড্রেস পরে আসেন। সুতরাং— ‘কমবেশি’ চলেই।
আজ লীলাবতীকে সাতচল্লিশ মনে হচ্ছে। ‘সেকি! দেখে তো বোঝাই যাচ্ছে না’ মানে লেভিডিভ এমনটিই বলতে চেয়েছিল, কিন্তু হজম করলো। যার মনে ষোড়শীর বাতাস, তাকে সাতচল্লিশের কথা বলা মানে স্টুডিওতে কালবৈশাখী ডেকে আনা। লেভিডিভ বললো, ‘তা যা বলেছেন, ষোড়শী বললে বেশিই হবে। বরং আরও কম। পুরো কিশোরী মনে হচ্ছে।’ কিশোরী শব্দটি উচ্চারণ করতেই লেভিডিভের চোখের সামনে হেমলতার মুখচ্ছবি ফুটে উঠল। কিশোরী হেমলতা। জীবননান্দের পাখির নীড়ের মতো চোখ, তার মাঝ দিয়ে নেমে আসা টিকালো নাকের নিচে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো ফিরফিরে ঠোঁট ক্ষণিকের জন্য মনে কাঁপন ধরিয়ে দিলো। ঠোঁট দুটো কাঁপছে। যেন কিছু বলতে চাইছে। সাইকেল চালিয়ে লেভিডিভ এগিয়ে যাচ্ছে। আরও কাছে। আরও একটু। হেম কী কথা বলতে চাইছে। আরেট্টু এগোলোই লেভিডভ শুনতে পাবে।

হঠাৎ লীলাবতীর কণ্ঠে চিন্তার ভেতর ছেদ পড়ল লেভিডভের। ‘আপনি কি আমার কথাটা শুনছেন?’ লেভিডিভ নড়েচড়ে বসল। বললো— ‘জ্বি, জ্বি। অবশ্যই। আচ্ছা, বলুন তো, কবি জীবনানন্দ তার বনলতা সেনে নাক আর ঠোটের উপমা কেন দেননি?’ লীলাবতী বললো, ‘জানি না।’ লেভিডভ হেসে বললো— ‘কারণ, আমি দেবো বলে।’
লীলাবতী একটু দুলে উঠে বললো— ‘যাহ!’ তারপর চোখ বড়বড় করে কৃত্রিম রাগে ঠোঁট উল্টে বললো, ‘ফ্লাট করা হচ্ছে, না?’ আজ নারীর সাদাসিধে জীবন নিয়ে আলোচনার কথা। লীলাবতী হঠাৎই বলে বসলো— ‘বলছিলাম, নারীর সম-অধিকার নিয়ে আপনার অনুষ্ঠানটায় একটা বিশেষ পর্ব করা যায় না?’
লেভিডিভের পেশাদারি মন ফিরে এলো। ক্যামেরার সামনে বসে থাকা লীলাবতীকে দেখলো। ভাবলো—বিপ্লবী, আগুনচোখা, বজ্র কণ্ঠের বত্রিশের এই ক্লান্ত নারীর চিন্তায় যে সাবজেক্ট খেলে গেলো, তার মনে কেন এলো না?
তাতক্ষণিক প্রযোজককে জানালো। প্রযোজকও সাবজেক্ট গিলে নিলো। আগের ডিসিশন চেঞ্জ। থ্রি, টু, ওয়ান, জিরো…. শুরু হলো, নারীর দুনিয়া।

লেভিড লীলাবতীকে দেওয়ার পরপরই শুরু হলো কথার বন্যা। বলতে শুরু করলো লীলাবতী। ‘ছেলেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে রাত দশটা পর্যন্ত থাকতে পারে, মেয়েরা কেন পারবে না?’ লেভিডিভ মাথা নাড়লো।‘পৈতৃক সম্পত্তিতে নারীর সমান অধিকার থাকবে না কেন?’ ‘অবশ্যই।’
‘বৈবাহিক সম্পত্তিতেও সমান অধিকার কেন নয়?’
‘অবশ্যই।’
‘নিজের শরীর, গর্ভধারণ, গর্ভপাত—সব বিষয়ে নারীর নিজের সিদ্ধান্তের অধিকার থাকতে হবে।’
লেভিডিভ আবার মাথা নাড়ল।
‘নারীকে পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির শেকল থেকে মুক্ত করতে হবে।’ এবার লেভিডিভের মনে হলো, আজকের অনুষ্ঠান বেশ জমবে। লীলাবতী থামল না।
‘চাকরির ক্ষেত্রে মেয়েদের সুযোগ কম। সংসারে মেয়ের কাজকে কাজ মনে করা হয় না? তারপর দেখুন, সংসারেও কতো বৈষম্য। নারীর কণ্ঠকে নিচে রাখতে বলা হয়। গরমে স্লিভলেস টপ পরে বাইরে বের হলে সমাজের চোখ টাটায়। সব পুরুষতান্ত্রিকতা। এটা কেন হবে?
লীলাবতী ছুটিয়ে চলছে, আর স্টুডিওর বাতাস ভারী হয়ে উঠছে।
লেভিডিভ মনে মনে ভাবলেন, আহা! এমন নারীই তো দেশের দরকার। যে প্রশ্ন করে। যে প্রতিবাদ করে। যে অন্যায়ের সামনে মাথা নত করে না। এমন মেয়ে যার সংসারে থাকবে, সে লাকি! গোছালো, অর্থকষ্টমুক্ত জীবন।
অনুষ্ঠানের এই পর্বটির টিআরপি রেকর্ড ছাড়ালো। প্রযোজক তো সে-ই খুশি। লীলাবতী আয়েশী ঢেকুর তুলে বিদায় নিলেন। কয়েক মাস পর লীলাবতীর কাছে বিয়ের সম্বন্ধ এলো। ঘটক এলেন। হাতে ছেলের ছবি। লীলাবতী ছবির দিকে তাকাল না। প্রথমেই জানতে চাইলো. ‘ছেলের ইনকাম কত?’ ঘটক একটু কেশে বললেন, ‘ভালোই।’
‘ভালোই মানে?’
ঘটক একটু নড়েচড়ে বললো, জমিদার ফ্যামিলির ছেলে। ইনকামের কি আর শেষ আছে! হাঁটতে-বসতেই টাকা ঝড়ে পড়ে। অঙ্কে বলা মুশকিল।

লীলাবতী মাথা নাড়ল। বললো, ‘দেনমোহর কত দেবে?’ ঘটক বললেন, ‘আলোচনা করে যতোটা চান আরকি!, ওতে বাধা নেই। ছেলে আপনাকে খুব পছন্দ করেছে। নারীর দুনিয়ায় দেখেছে।’ ‘ওসব কিছু না। বলতে হবে—কত?’ লীলাবতীর কথা শুনে ঘটক মোবাইল টিপল। তারপর কেটে দিয়ে জানালো, লাখ দশেক তো পাবেনই।
লীলাবতী যে সন্তুষ্ট হলো না, ‘বিষয়-সম্পত্তি কতো আছে যেন বলছিলেন?’ ঘটক বললো, ‘না, এখনও বলিনি। তবে জমিদার ফ্যামিলি।’ তারপর তালিকা এগিয়ে দিয়ে বললো, গুনে শেষ হবে না। লীলাবতীর সাফ কথা, ‘আমার ভাগে কত?’ ঘটক এবার একটু অবাক হলেন। বললেন— ‘বিয়ের আগেই ভাগ?’
লীলাবতী তাকাল, ‘সম-অধিকার বোঝেন?’ ঘটক ‘না সূচক’ মাথা নাড়লেন। লীলাবতী বিষ্ময়ে তার দিকে চেয়ে রইলেন। শেষ পর্যন্ত দশ লাখ টাকা দেনমোহরে বিয়ে হলো। লেভিডিভও শুনলো। শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো। দেনমোহরের কথা শুনে তার মাথায় তখন টকশোর পুরোনো প্রশ্নগুলো ঘুরছে—পৈতৃক সম্পত্তিতে সমান অধিকার, বৈবাহিক সম্পত্তিতে সমান অধিকার, নারীর নিজের সিদ্ধান্তের অধিকার।
তারপর ভাবলেন, অধিকার বড় বিচিত্র জিনিস। মঞ্চে তার সংজ্ঞা একরকম, সংসারে আরেকরকম। আদার ব্যাপারী, জাহাজের খবর নিয়ে লাভ নেই। অধিকারের ভাবনা শেষ করে লীলাবতীর সাথে টকশোয়ের দিন হেমলতাকে নিয়ে অসমাপ্ত ভাবনা তার চোখে ভর করলো। লিভিডভ সাইকেল চালিয়ে তার কাছাকাছি যাচ্ছে। আরও কাছাকাছি। বিম্বিসার অশোকের দেশে পৌঁছে যাচ্ছে সে। শ্রাবস্তীর কারুকার্যময় হেমলতার মুখ স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা, হাল ছেড়ে লিভিডভ যেন হারিয়ে যাচ্ছে। দুলে দুলে হেঁটে তার কাছে আসছে হেমলতা। তারপর বললো, ‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’ লিভিডভ কিছু বলতে পারছে না। এমন অবস্থা দেখে হেমলতা লিভিডভের বাহুতে মধ্যমা ঠেঁকিয়ে আবার বললো, ‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’

ধাক্কা খেয়ে জেগে উঠলো লিভিডভ। তাকিয়ে দেখলো, সামনে লীলাবতী দাঁড়িয়ে। রাজনীতি নিয়ে টকশো আছে। সেখানে অতিথি হয়ে এসেছে। তার স্বামী মাপের নেতা। তার কাছে আবদার করেছিলো, যদি সংরক্ষিত আসনে সিট না পায়, তবে বাপের বাড়ি চলে যাবে।
বিপ্লবের সামনে সংসার দাঁড়ালে সংসার সাধারণত একটু দুর্বল হয়ে পড়ে। লীলাবতী স্বামী তার আবদার রেখেছেন। সে এখন আইনকক্ষের সদস্য।
লিভিডভের নারীর দুনিয়ার শ্যুট আগেই শেষ হয়েছিলো। লীলাবতীরও শো-এর সময় শুরু। বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়লো লিভিডভ। তারপর গণপরিবহনে চড়লো। ওঠার সময় তাকে ধাক্কা দিয়ে এক নারী বাসে উঠলো। জিন্স, টি-শার্ট পরা। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, চরম প্রগতিশীল। সোজা গিয়ে নারী ও প্রতিবন্ধিদের জন্য সংরক্ষিত আসনে গিয়ে বসল।
লিভিডভ বাদুর ঝোলা হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। ভিড়ের মাঝে জোনাকির মতো ফাঁকা স্থান দিয়ে জানালার বাইরে তাকালো।  শহর ছুটছে। মানুষ ছুটছে। সম-অধিকারও ছুটছে। যে যার গন্তব্যে ছুটছে। দেনমোহর ছুটছে, পুরুষের কাছে নারীর যৌতুকও নীরবে ছুটছে, সংরক্ষিত আসন ছুটছে?
লেভিডিভের মনে আবার হেমলতার মুখ ভেসে উঠল। সাইকেল। বাতাস। খুব কাছাকাছি চলে আসা। হেম কী যেন বলতে চাইছে!

লেখক : কথাশিল্পী