সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬, ০৬:৩৩ পূর্বাহ্ন

নীরব বিচার

রৌদ্রছায়া প্রকাশ ডেস্ক / ৭৫ বার পঠিত
প্রকাশিত সময় : শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬, ০৭:৩২ অপরাহ্ন

নীরব বিচার
মোশারফ হোসেন

রাত আটটা। একটি ফ্ল্যাটের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ইয়াসমিন। হাতে কফি, কিন্তু তা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। তাঁর চোখ স্থির মোবাইলের স্ক্রিনে; আবারও এক কিশোরী ধর্ষণের শিকার, আবারও আসামি পলাতক, আবারও আইনের ব্যর্থতা।

পেছন থেকে হাসিব এসে তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন। তাঁর স্বামী। পনেরো বছর ধরে একসঙ্গে; আর্মি মেডিকেলকোরে একসঙ্গে পড়াশোনা, একসঙ্গে চাকরি, একসঙ্গে জীবন। হাসিবের গায়ে এখনও অফিসের গন্ধ। তিনি ইয়াসমিনের কপালে ঠোঁট রাখলেন। ‘কী দেখছো?’ কণ্ঠে মৃদু স্নেহ।

ইয়াসমিন ফোনটা তাঁর হাতে তুলে দিল। ‘দেখ, হাসিব। আবার। আমার মনে হচ্ছে, আমি প্রতিদিন একটা মৃতদেহ দেখছি, অথচ কিছুই করতে পারছি না।’

হাসিব খবরগুলো পড়লেন। তিনি জানেন, ইয়াসমিন শুধু ডাক্তারি পেশার দায়িত্বেই এতটা বিচলিত নয়; এই খবরগুলো তাঁর নিজের জীবনের কালো অধ্যায়কে টেনে আনে। হাসিবই একমাত্র মানুষ, যাকে ইয়াসমিন তাঁর নয় বছর বয়সের সেই ভয়ঙ্কর স্মৃতি বলেছে। সেই রাতে ইয়াসমিন কাঁদতে কাঁদতে তাঁর বুকে মাথা রেখেছিল, আর হাসিব তখনই প্রতিজ্ঞা করেছিল; এই নারীকে আর কোনোদিন কাঁদতে দেবে না।

হাসিব তাঁকে টেনে বসালেন সোফায়। নিজেও পাশে বসলেন। তাঁর ডান হাতটা ইয়াসমিনের বাঁ হাতের উপর রাখলেন; যে হাত প্রতিদিন অস্ত্রোপচার করে, যার স্পর্শে মানুষ বাঁচে, কিন্তু সে হাতটা আজ কাঁপছে।

‘ইয়াসমিন, তুমি যা ভাবছ, আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু একা পারবে না। আমরা যদি কিছু করতে চাই, একসঙ্গে করতে হবে। আমি তোমার পাশে আছি; শুধু সহকর্মী হিসেবে না, স্বামী হিসেবে। তুমি যেখানে দাঁড়াতে চাও, আমি সেখানে দাঁড়াব। তুমি যদি ডুবে যাও, আমিও ডুবব।’

ইয়াসমিন চোখ তুলে তাঁর দিকে তাকালেন। চোখের কোণে তখনও জল। ‘হাসিব, আমি যদি পাগলের মতো কিছু করতে চাই?’

‘তাহলে আমিও পাগল হব। কারণ তুমি আমার অর্ধেক, ইয়াসমিন। তোমার যন্ত্রণা আমার যন্ত্রণা।’

সেদিন রাতেই তাঁদের সিদ্ধান্ত পাকা হলো। পরদিন তারা ক্যান্টনমেন্ট চিফের কাছে গেলেন; শুধু দুই ডাক্তার হিসেবে নয়, দুই সঙ্গী হিসেবে, যারা একে অপরের জন্য জীবন বাজি রেখে চলতে পারে।

চিফ যখন প্রথম প্রস্তাব শুনলেন, তিনি চমকে উঠলেন। ইয়াসমিন তাঁর প্রস্তাবের ভয়াবহতা বুঝিয়ে বলছিলেন, আর হাসিবের চোখ তখন শুধু ইয়াসমিনের দিকে। তিনি দেখছিলেন তাঁর স্ত্রীর চোখে সেই আগুন, যে আগুন নয় বছর বয়সে নিভিয়ে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু আজ তা প্রজ্জ্বলিত হচ্ছে। তিনি নিজের হাতটা ইয়াসমিনের হাতের উপর রাখলেন; একটা নীরব বার্তা : আমি আছি।

চিফ অবশেষে রাজি হলেন, ইয়াসমিনের চোখে প্রথমবারের মতো স্বস্তি ফিরল। ফেরার পথে হাসিব গাড়ি চালাচ্ছিলেন। ইয়াসমিন জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, ‘হাসিব, আমি কি খুব খারাপ মানুষ?’

হাসিব গতি কমিয়ে তাঁর দিকে তাকাল। ‘তুমি খুব ভালো মানুষ, যাকে খারাপ পৃথিবী ভালো হতে বাধ্য করেছে। আর আমাকে যে তুমি বেছে নিয়েছো, সেটাই প্রমাণ করে তুমি কত ভালো।’

ইয়াসমিন হাসলেন ; বহুদিন পর সত্যিকারের হাসি।

গোপন বাংকারে ক্লিন ইমেজ প্রকল্প শুরু হলো। অপারেশন থিয়েটারে একসঙ্গে দাঁড়ান ইয়াসমিন ও হাসিব। একজন সার্জন, অন্যজন অ্যানেসথেসিওলজিস্ট ও সহকারী। তাঁদের হাতের কাজে কোনো ভুল নেই; কারণ তাঁরা পনেরো বছর ধরে একসঙ্গে অপারেশন করছেন, তাঁদের মধ্যকার সমন্বয় যেন এক প্রাণের স্পন্দন।

প্রথম অপারেশন। রাজনীতিকের ছেলে; যে কৃষক মেয়েকে ধর্ষণ করে খুন করেছে। টেবিলে অজ্ঞান রোগী । ইয়াসমিন স্ক্যালপেল হাতে নিলেন, কিন্তু হাত কাঁপল। তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই নয় বছর বয়সী মেয়েটা; যার কান্না কেউ শোনেনি।

হাসিব তাঁর হাতের উপর নিজের হাত রাখলেন। অপারেশন থিয়েটারের নীরবতার মধ্যে তিনি ফিসফিস করে বললেন, ‘দেখো, আমি এখানে আছি। তুমি যা করছো, তা ভুল নয়। তুমি পৃথিবীকে একটু বেশি নিরাপদ করছো। এটা আমার বিশ্বাস ।’

ইয়াসমিন চোখ বন্ধ করলেন, গভীর শ্বাস নিলেন, আর তারপর শুরু করলেন। প্রথম কাটা, দ্বিতীয় কাটা; হাত একদম স্থির। হাসিব পাশে দাঁড়িয়ে সারাক্ষণ তাঁর দিকে তাকিয়ে ছিল; শুধু রোগী নয়, তাঁর স্ত্রীকেও পর্যবেক্ষণ করছিল। সে জানে, এই কাজ ইয়াসমিনকে ভেতর থেকে খেয়ে ফেলছে। রাতে যখন তারা বাড়ি ফেরে, ইয়াসমিন অনেক সময় বাথরুমে চুপচাপ বসে থাকে। তখন হাসিব দরজার বাইরে বসে থাকে; কোনো কথা বলে না, শুধু জানায়, সে আছে।

এক রাতে ইয়াসমিন বিছানায় শুয়ে হাসিবের বুকে মাথা রেখে বলল, ‘আমরা প্রতিদিন মানুষের লিঙ্গ বদলে দিচ্ছি। কিন্তু আমি কি তাদের আত্মা বদলে দিতে পারছি? কখনো কখনো ভাবি, আমি কি দেবতা, নাকি দানব?’

হাসিব তাঁর চুলে হাত বুলিয়ে বলল, ‘তুমি দেবতা নও, দানবও নও। তুমি একজন ডাক্তার, যে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সমাজকে সারানোর চেষ্টা করছে। আর আমি তোমার সেই চেষ্টার সাক্ষী। তুমি যতবার ভাববে তুমি দানব, ততবার আমি বলব; তুমি আমার দেবী।’

ইয়াসমিন হাসল। তাঁর চোখে ঘুম এল। হাসিব তাঁকে জড়িয়ে শুয়ে রইল; যেন পৃথিবীর সব ভয়কে সে নিজের বুকের মধ্যে আটকে রেখেছে, যাতে স্ত্রী নিরাপদে ঘুমাতে পারে।

একদিন ইয়াসমিন রোগী দেখতে গিয়ে জানতে পারল, তাদের ধরা একজন পুলিশ অফিসার আসলে একজন বিখ্যাত মানবপাচারকারীর আত্মীয়। সে ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজের অপরাধ ঢাকত। ইয়াসমিন রেগে গিয়ে অপারেশন টেবিলে তাঁর দিকে তাকিয়ে ছিল। তখন হাসিব হাত ধরে বলল, ‘শান্ত হও। আমরা বিচার করছি, কিন্তু আবেগে কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নয়। যদি এই অপারেশন ঠিকমতো না হয়, তাহলে তুমি অন্যায়ের শাস্তি দিতে গিয়ে অন্যায় করে বসবে।’

ইয়াসমিন থমকে দাঁড়াল। হাসিবের কথার মধ্যে প্রবল যুক্তি আছে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি আছে তার প্রতি গভীর মমতা। সে চায় না তার স্ত্রী নিজের নৈতিক মানদণ্ড থেকে স্খলিত হোক।

ইয়াসমিন ধীরে ধীরে শান্ত হলো, আর অপারেশন শেষ করল নিখুঁতভাবে। রাতে হাসিব তাঁকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘তুমি শক্তিশালী, ইয়াসমিন। এত শক্তিশালী যে তোমার পাশে দাঁড়িয়ে আমিও শক্তিশালী বোধ করি।’

অক্টোবর মাস। বৃষ্টি। হাসিব অফিসে ফাইল স্ক্রল করছেন, আর ইয়াসমিন কফি হাতে পাশে দাঁড়িয়ে। হঠাৎ হাসিবের চোখ আটকে গেল ফাইল নম্বর ১১৫০০-এ। তিনি নাম দেখলেন; আবদুল করিম। হাসিবের বুকের ভেতর দম বন্ধ হয়ে এলো। তিনি জানেন, এই নাম ইয়াসমিনের জীবন উল্টে দিয়েছিল। তিনি চুপ করে ফাইলটা বন্ধ করতে গেলেন, কিন্তু ইয়াসমিন তা দেখে ফেললেন।

‘ওটা কী, হাসিব? দেখাও।’
‘ইয়াসমিন, না ! ’
‘দেখাও!’

হাসিব জানতেন, লুকোনো অর্থহীন। তিনি ফাইলটা খুলে দিলেন। স্ক্রিনে আবদুল করিমের ছবি; যে মানুষটি নয় বছর বয়সী ইয়াসমিনের সবকিছু কেড়ে নিয়েছিল। ইয়াসমিনের কফির কাপ পড়ে গেল। তাঁর চোখ স্থির হয়ে গেল। তিনি পিছিয়ে গিয়ে দেয়ালে ঠেস দিলেন। হাসিব দৌড়ে গিয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন। ‘আমি আছি, আমি আছি। তুমি একা নও।’

ইয়াসমিনের ঠোঁট কাঁপছে। নয় বছর বয়সী সেই মেয়েটা আজ তার ভেতর থেকে চিৎকার করে উঠল; সেই অন্ধকার ঘর, সেই ব্যথা, সেই লজ্জা, সেই নীরবতা। হাসিব তাঁকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন, যেন পৃথিবীর সব ভূতকে নিজের শরীর দিয়ে বাধা দেন। তাঁর চোখ দিয়েও জল গড়িয়ে পড়ল; তিনি তাঁর স্ত্রীর ব্যথা নিজের ভেতর অনুভব করছেন।

‘ইয়াসমিন, আমি জানি তুমি কী পার করেছ। কিন্তু আমি তোমাকে বলছি, এই অপারেশন আমি করব না। তুমি করবে না। আমি তোমাকে আরও একবার এই মানুষটার সামনে দাঁড়াতে দেব না।’

ইয়াসমিন হাসিবের বুকে মাথা রেখে কাঁদতে লাগল। বহুদিন পর তিনি এতটা ভেঙে পড়লেন। ‘হাসিব, আমি তাকে ক্ষমা করতে পারছি না। আমি চাই সে বুঝুক, কী করেছিল সে। আমি চাই সে নিজের শরীরেই ভোগ করুক সেই লজ্জা; যে লজ্জা আমাকে গ্রাম ছাড়তে বাধ্য করেছিল, যে লজ্জা আমার বাবা-মাকে নিঃস্ব করেছিল।’
হাসিব তাঁর চোখের জল মুছে দিলেন। ‘তাহলে তুমি করো। কিন্তু আমি তোমার সঙ্গে থাকব। অপারেশন রুমে তোমার পাশে দাঁড়াব। যেদিন তুমি কাটবে, সেদিন আমি তোমার হাত ধরে রাখব। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো, ইয়াসমি ; তুমি যাই করো না কেন, আমি তোমাকে ভালোবাসি। এই ভালোবাসা তোমার পাপকে ধুয়ে দেবে, যদি পাপও হয়।’

পরদিন অপারেশন রুম। আবদুল করিম অজ্ঞান। ইয়াসমিন স্ক্যালপেল হাতে নিয়ে কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। হাসিব পাশে দাঁড়িয়ে। তিনি ইয়াসমিনের কাঁধে হাত রাখলেন।

ইয়াসমিন চোখ বন্ধ করে সেই রাতের কথা মনে করল; আমগাছের নিচে, অন্ধকার ঘরে, নয় বছরের অসহায়তা। তারপর তিনি চোখ খুললেন। হাসিবের চোখে তিনি নিজের প্রতিচ্ছবি দেখলেন; একজন নারী, যার পাশে একজন পুরুষ আছে, যে কোনো অপরাধকে ভালোবাসায় ঢেকে দিতে পারে।

অপারেশন শুরু হলো। ঘণ্টার পর ঘণ্টা। হাসিব ইয়াসমিনের প্রতিটি নিঃশ্বাস গণনা করছিল। তিনি দেখলেন ইয়াসমিনের হাত একদম স্থির, কিন্তু তাঁর চোখের কোণ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে মাস্কের ভেতর। হাসিবও কাঁদছিল নীরবে; কারণ তার স্ত্রী যে যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা সে নিজেও অনুভব করছে।

অপারেশন শেষ। ইয়াসমিন মাস্ক খুলে ফেলল। তাঁর মুখ ফ্যাকাশে। হাসিব তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন। দুজনেই কাঁদতে লাগলেন; এই কান্নায় ছিল বহু বছরের চাপা যন্ত্রণা, ছিল প্রতিশোধের অবসান, ছিল এক অদ্ভুত মুক্তি। হাসিব তাঁর কানে কানে বলল, ‘তুমি পেরেছো, ইয়াসমিন। এখন এই মানুষটাকে ভুলে যাও। কিন্তু আমাকে ভুলবে না, কারণ আমি তোমার সঙ্গে আছি।’

ইয়াসমিন হাসিবের বুকে মাথা রেখে বলল, ‘তুমি না থাকলে আমি পাগল হয়ে যেতাম।’
‘তাই তো আছি ; তোমার পাগলামি ভাগ করে নিতে।’

চিফ যখন অবসর নেওয়ার আগে বাংকার বন্ধ করার নির্দেশ দিলেন, তখন ইয়াসমিন কিছুক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আট বছর, ১১,৪৪৯ জন; এই বাংকার যেন তাঁর দ্বিতীয় সন্তান। হাসিব পাশে এসে তাঁর হাত ধরলেন।

গত আট বছরে ১১,৪৪৯ জন বলৎকারী বা ধর্ষককে তাদের বাড়ি থেকে, অফিস থেকে, এমনকি কারাগার থেকেও তুলে আনা হয়। প্রত্যেকের লিঙ্গান্তর করা হয়। গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৪-৫ জন। যত শক্তিশালী, প্রভাবশালী, ধনী—কেউ রেহাই পায় না। এক মাস পর তারা ফিরে আসে। কণ্ঠ পাল্টানো, মুখে হরমোনের প্রভাব, নতুন শরীর। সমাজ প্রথমে আতঙ্কিত হয়। গণমাধ্যমে নাম দেয়—“দি ইনভিজিবল কাটার” (অদৃশ্য কর্তনকারী)।

পুলিশ ব্যর্থভাবে খোঁজ চালায়, কিন্তু কোনো কূল পায় না। সন্ত্রস্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ধীরে ধীরে মামলা গোপন করতে থাকে, কারণ ওপরওয়ালারা নিজেরাও ভয় পেতে শুরু করে—কারও কারও আত্মীয়স্বজন এরইমধ্যে এই তালিকায় চলে এসেছে।
ধর্ষণের হার নাটকীয়ভাবে কমতে থাকে।
প্রথম বছরে ৩০%,
তৃতীয় বছরে ৬০%,
অষ্টম বছরে তা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে।
স্কুলের মেয়েরা নিরাপদে স্কুলে যেতে পারে। রাতের রাস্তায় নারীরা একা চলতে ভয় পায় না। নিরাপত্তার এই পরিবর্তন ছিল অভূতপূর্ব।
তবে এর একটি লজিক্যাল পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছিল—সমাজে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যায়। এই ১১,৪৪৯ জন মানুষ নতুন পরিচয়ে সমাজে ফিরে এসে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। তাদের মধ্যে অনেকে পরিবার-পরিজন দ্বারা পরিত্যক্ত হয়, চাকরি হারায়, বাসস্থান হারায়। ইয়াসমিন ও হাসিব এটা দেখে দুশ্চিন্তায় পড়েন—তারা কি আসলে সমাজের সমস্যা সমাধান করলেন, নাকি নতুন সমস্যা তৈরি করলেন?
শেষ অপারেশন শেষ করলেন তাঁরা। তারপর সব ফাইল পুড়িয়ে দিলেন, মেশিন ভেঙে ফেললেন, বাংকারের দরজায় ইট গাঁথতে শুরু করলেন। শেষ ইটটা যখন ইয়াসমিন হাতে নিলেন, তাঁর হাত কাঁপছিল। হাসিব এসে তাঁর হাতের উপর নিজের হাত রাখলেন; একসঙ্গে তাঁরা সেই ইটটা বসিয়ে দিলেন। বাংকার চিরতরে বন্ধ।

বাইরে বেরিয়ে হাসিব ইয়াসমিনের কাঁধে হাত রাখলেন। বৃষ্টি শুরু হয়েছে। দুজনেই ভিজছে, কিন্তু কেউ সরছে না।

‘শেষ হলো, হাসিব।’
‘শেষ হলো না, ইয়াসমিন। তোমার জীবন শেষ হয়নি। আমাদের জীবন এখনও বাকি। এবার আমরা আমাদের জন্য বাঁচব।’

ইয়াসমিন হাসিবের দিকে তাকালেন। পনেরো বছর আগে যখন তাঁরা বিয়ে করেছিলেন, হাসিব বলেছিল, ‘তোমার সব দুঃখ আমি নিজের করে নেব।’ সেদিন ইয়াসমিন ভেবেছিল এটা শুধু প্রেমিকের কথা। কিন্তু আজ সে দেখল, হাসিব সত্যিই প্রতিটি মুহূর্তে তার দুঃখকে নিজের করে নিয়েছে; অপারেশন রুমে, রাতের অন্ধকারে, কান্নার মধ্যেও।

‘হাসিব, আমি কি তোমাকে খুব কষ্ট দিয়েছি?’

হাসিব তাঁর ভেজা চুল থেকে জল মুছে দিল। ‘তুমি আমাকে কষ্ট দাওনি, তুমি আমাকে অর্থ দিয়েছ। তোমার সঙ্গে থাকাটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা।’

ইয়াসমিন অবসর নিলেন। সবাই ভেবেছিল তিনি ঢাকায় থাকবেন, কিন্তু তিনি ঘোষণা করলেন; বাঘমারায় ফ্রি ক্লিনিক খুলবেন। যে গ্রাম থেকে পালিয়েছিলেন, সেখানেই ফিরবেন। হাসিব তখনও চাকরিতে ছিলেন। কিন্তু ইয়াসমিনের সিদ্ধান্ত শুনে তিনি বললেন, ‘আমিও অবসর নিচ্ছি।’

‘কেন? তোমার তো এখনও সময় আছে।’

হাসিব তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তুমি যদি বাঘমারায় যাও, আমি কেন এখানে বসে থাকব? তুমি আমার স্ত্রী। তোমার ক্লিনিকের অ্যাডমিনিস্ট্রেটর আমি হব। চা বানাব, রোগীদের ফাইল রাখব, আর রাতে তোমার ক্লান্ত হাত ম্যাসাজ করব। তুমি কি আমাকে ছাড়া পারবে?’

ইয়াসমিনের চোখে জল। তিনি হাসিবকে জড়িয়ে ধরলেন। ‘পারব না, হাসিব। তুমি ছাড়া আমি এক ফোঁটা অস্ত্রোপচারও করতে পারি না।’

বাঘমারায় ফিরে তারা পুরোনো পরিত্যক্ত বাড়ি মেরামত করে ‘নিরাময় ক্লিনিক’ তৈরি করলেন। ইয়াসমিনের বৃদ্ধ বাবা-মাও ফিরে এলেন। মা যখন প্রথম ক্লিনিক দেখলেন, তিনি কাঁদতে লাগলেন; এই গ্রাম থেকে যে লজ্জা নিয়ে তাঁরা পালিয়েছিলেন, আজ সেই লজ্জার জায়গায় গড়ে উঠেছে নিরাময়ের কেন্দ্র।

হাসিব ক্লিনিকের সব দায়িত্ব নিলেন। সকালে তিনি রোগীদের রেজিস্ট্রেশন করান, ইয়াসমিনের অপারেশনের সময় পাশে দাঁড়ান, বিকেলে ক্লিনিকের পেছনের বাগানে চা বানান। গ্রামের লোকেরা প্রথমে অবিশ্বাস করলেও ধীরে ধীরে তাঁদের বিশ্বাস অর্জন করলেন।

একদিন সন্ধ্যায় যখন আবদুল করিম শেষ পর্যায়ের ক্যান্সার নিয়ে ক্লিনিকে এল, হাসিব প্রথমে প্রতিবাদ করলেন। তিনি ইয়াসমিনকে টেনে একপাশে নিয়ে বললেন, ‘ইয়াসমিন, ওকে মরতে দাও। তুমি কেন নিজেকে আবার কষ্ট দিচ্ছো?’

ইয়াসমিন হাসিবের হাত ধরে বলল, ‘হাসিব, আমি যদি এখন এই মানুষটাকে ফিরিয়ে দিই, তাহলে আমি সেই ডাক্তার নই, যাকে তুমি ভালোবাসো। আমি চাই তুমি আমার পাশে থাকো; শুধু সহকর্মী না, স্বামী হিসেবে। আমাকে এই যাত্রায় সঙ্গ দাও।’

হাসিব দীর্ঘশ্বাস ফেলে ইয়াসমিনের কপালে চুমু দিল। ‘তুমি সবচেয়ে বড় মানুষ, ইয়াসমিন। আমি তোমার পাশেই থাকব; তোমার ভালোতে, তোমার কষ্টেও।’

পরের তিন মাস হাসিব প্রতিদিন করিমকে দেখাশোনা করত, ওষুধ দিত, খাওয়াত। ইয়াসমিন যখন অপারেশন করত, হাসিব পাশে দাঁড়িয়ে হাত ধরে রাখত। করিম যখন মারা গেল, হাসিব নিজেই তাঁর কবর খুঁড়ে দিল; ইয়াসমিনকে কষ্ট না দেওয়ার জন্য।

করিমের মৃত্যুর পর রাতে বাড়ি ফিরে ইয়াসমিন হাসিবের বুকে মাথা রেখে বলল, ‘আজ মনে হচ্ছে, আমার সব যুদ্ধ শেষ হলো।’
হাসিব তাঁর চুলে হাত বুলিয়ে বলল, ‘শেষ হলো, ইয়াসমিন। এখন শুধু শান্তি। আর আমি তোমার সেই শান্তির সঙ্গী।’

নিরাময় ক্লিনিকের বারান্দায় দুজন বসে চা খাচ্ছেন; ইয়াসমিন আর হাসিব। তাদের চুলে রূপালি আভা, মুখে শান্তির ছাপ। সামনে ধানের ক্ষেত, দূরে শিশুরা খেলছে। গ্রামের মেয়েরা এখন নির্বিঘ্নে ক্লিনিকে আসে, হাসিব তাদের সঙ্গে আড্ডা দেয়, ইয়াসমিন তাদের রোগ নির্ণয় করে।

একটি ছোট মেয়ে ক্লিনিকে এসে বলল, ‘আপু, আমি ডাক্তার হতে চাই।’ ইয়াসমিন তাকে কোলে তুলে নিল। হাসিব পাশে দাঁড়িয়ে হাসছে।

ইয়াসমিন মেয়েটাকে বলল, ‘পারবি। কিন্তু মনে রাখবি; ডাক্তারি মানে শুধু অস্ত্রোপচার না, ডাক্তারি মানে মানুষের পাশে দাঁড়ানো। আর যদি তোর পাশে কেউ থাকে, যে তোর সব কষ্ট ভাগ করে নেয়, তাহলে তুই বিশ্বের সেরা ডাক্তার হতে পারবি।’

সে হাসিবের দিকে তাকাল। হাসিব চোখ মেলে বলল, ‘যেমন আমার পাশে ইয়াসমিন!’ ইয়াসমিন হাসল। পনেরো বছর ধরে এই মানুষটি তার পাশে আছে; অপারেশন রুমে, রাতের অন্ধকারে, লজ্জায়, গর্বে, প্রতিশোধে, নিরাময়ে। সে তার সহকর্মী, সে তার স্বামী, সে তার সবচেয়ে বড় শক্তি।

সেদিন সন্ধ্যায় ইয়াসমিন শেষবারের মতো ডায়েরি খুলে লিখলেন –
‘আমি ভেবেছিলাম নীরব বিচার দিয়েই আমি শান্তি পাব। কিন্তু শান্তি পেলাম নীরব নিরাময়ে, আর তার সঙ্গে ছিল হাসিব; যে আমার বিচারকে আলিঙ্গন করেছে, আমার অপরাধকে নিজের করে নিয়েছে, আমাকে নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছে। ভালোবাসাই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ওষুধ।’

ডায়েরি বন্ধ করে তিনি জানালার বাইরে তাকালেন। হাসিব পেছন থেকে এসে তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন। তারা দুজন নীরবে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল, যেখানে তারাগুলো জ্বলছে; ঠিক যেমন তাদের ভালোবাসা, নীরব কিন্তু অম্লান।

লেখক : গল্পকার ও নাট্যকর্মী

আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...